ভূমি মানুষের কাছে শুধু একটি সম্পদ নয়; এটি তার জীবন-জীবিকা, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আশ্রয়। আর সেই ভূমির ওপর নির্ধারিত সরকারি রাজস্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভূমি উন্নয়ন কর। রাষ্ট্রের প্রাপ্য কর যথাযথভাবে আদায় হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কর নির্ধারণ ও আদায়ের প্রক্রিয়ায় যদি স্বচ্ছতার অভাব থাকে, এক অঙ্কের দাবির পরিবর্তে অন্য অঙ্কে মীমাংসার
অভিযোগ ওঠে, কিংবা আইনে থাকা কর মওকুফের সুবিধা থেকেও সাধারণ কৃষক বঞ্চিত হন, তাহলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সম্প্রতি নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার ৪৮ নম্বর একটি হোল্ডিংকে ঘিরে এমনই একটি অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই হোল্ডিংয়ের ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ ১ লাখ ৪ হাজার ১২৫ টাকা দাবির বিপরীতে মাত্র ৩৮ হাজার ৮০০ টাকায় বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে।
অভিযোগটি সত্য হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, সরকারি হিসাবে এক লাখ চার হাজার ১২৫ টাকা নির্ধারিত হওয়ার পর তা কীভাবে ৩৮ হাজার ৮০০ টাকায় নেমে এলো? কোন বিধানের ভিত্তিতে এই পরিবর্তন করা হলো ? কার অনুমোদনে হলো? রাষ্ট্রের রাজস্বের ক্ষেত্রে এমন বড় পার্থক্যের লিখিত ব্যাখ্যা কি রয়েছে?
একটি অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। তবে এ ধরনের অভিযোগ যদি প্রায়ই শোনা যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা। কারণ ভূমি উন্নয়ন কর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত অর্থ নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজস্ব। তাই কর নির্ধারণ, আদায় কিংবা সমন্বয়ের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা অপরিহার্য।
অন্যদিকে সাধারণ কৃষকদের জন্য আইনেও রয়েছে বিশেষ সুবিধা। ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী কৃষিকার্যের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি বা পরিবারভিত্তিক কৃষিজমির মোট পরিমাণ ২৫ বিঘা বা ৮ দশমিক ২৫ একর পর্যন্ত হলে ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই সুবিধা পাওয়া নিয়ে কৃষকদের মধ্যে নানা অভিযোগ রয়েছে। অনেক কৃষক জানেন না তাদের জমি কর মওকুফের আওতায় পড়ে কি না। কেউ কেউ জানলেও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় নানা দপ্তরে ঘুরতে হয়।
আবার কারও অভিযোগ, মওকুফের আওতায় থাকা সত্ত্বেও ভূমি উন্নয়ন করের দাবি তৈরি করা হচ্ছে ও দিতে বাধ্য করা হচ্ছে । এখানেই প্রশ্ন আসে,আইনে যদি কৃষকের জন্য মওকুফের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে সেই অধিকার নিশ্চিত করতে একজন কৃষককে কেন হয়রানির শিকার হতে হবে?
বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক পরিবার খুব বেশি জমির মালিক নয়। তাদের জমি থেকে উৎপাদিত ফসল দিয়েই সংসার চলে। এমন একটি পরিবারের কাছে ভূমি উন্নয়ন করের অযৌক্তিক দাবি যেমন আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে, তেমনি ভূমি-সংক্রান্ত দপ্তরে বারবার যাতায়াতও সময় ও অর্থের অপচয় ঘটায়। বিশেষ করে বয়স্ক কৃষক, নারী, দরিদ্র ও প্রান্তিক ভূমিমালিকদের জন্য এই ভোগান্তি আরও বেশি। ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান করতে পারে। একজন ভূমিমালিকের নামে কোথায় কত জমি রয়েছে, জমির শ্রেণি কী, কত টাকা ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারিত হয়েছে, কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং কোনো জমি কর মওকুফের আওতায় আছে কি না, এসব তথ্য যদি অনলাইনে সহজে দেখা যায়, তাহলে অনিয়মের সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে কোনো হোল্ডিংয়ে হঠাৎ করে করের পরিমাণ পরিবর্তন হলে তার কারণও ডিজিটাল রেকর্ডে সংরক্ষিত থাকা উচিত। এক লাখ চার হাজার ১২৫ টাকা থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টাকায় কর নির্ধারণ বা মীমাংসা হলে তার পেছনে কী আইনগত কারণ রয়েছে, কে অনুমোদন দিয়েছেন এবং কীভাবে হিসাব পরিবর্তন হয়েছে,এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট ভূমিমালিকের জানার অধিকার থাকা উচিত। ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করতে নিয়মিত অডিটের ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন। কোনো হোল্ডিংয়ে অস্বাভাবিকভাবে বেশি কিংবা কম কর নির্ধারিত হলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাইয়ের আওতায় আনা যেতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিকের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা দরকার।
তবে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন এবং কঠোর জবাবদিহি। সরকারি দায়িত্বে থেকে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে করের হিসাব পরিবর্তন করেন, সরকারি রাজস্বের ক্ষতি করেন কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আবার কোনো নাগরিক যদি ভুল তথ্য দিয়ে কর কমানোর চেষ্টা করেন, তার বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ভূমি উন্নয়ন কর আদায় রাষ্ট্রের প্রয়োজন। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের নামে কৃষককে হয়রানি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি করাও মেনে নেওয়া যায় না। তাই প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্র তার প্রাপ্য রাজস্ব পাবে এবং একই সঙ্গে একজন সাধারণ কৃষক তার আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না। চাটখিল উপজেলার ৪৮ নম্বর হোল্ডিংয়ের অভিযোগ সত্য কি না, সেটি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কিন্তু এই অভিযোগ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে, ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ কি যথেষ্ট স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি পাচ্ছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে অভিযোগকে উপেক্ষা না করে তদন্ত করতে হবে। কর নির্ধারণের পদ্ধতি সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। আইন অনুযায়ী ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমির কর মওকুফের সুবিধা প্রকৃত কৃষকের কাছে নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব নিয়ে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। ভূমি অফিস হবে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জায়গা, হয়রানির জায়গা নয়। কৃষকের জমি যেমন তার জীবনের অবলম্বন, তেমনি ভূমি উন্নয়ন কর রাষ্ট্রের বৈধ রাজস্ব। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার পথ একটাই আইনের যথাযথ প্রয়োগ, ডিজিটাল স্বচ্ছতা, নিয়মিত তদারকি এবং কঠোর জবাবদিহি। তাহলেই ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব হয়ে উঠবে।
লেখক: প্রধান শিক্ষক, সেওজগাতি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, শালিখা।
খুলনা গেজেট/এএজে

